সোনা কিনে আমি সাড়ে চার লাখ টাকা গচ্চা দিয়েছি - আপনারা এই ভুল করবেন না।
আমার নাম ফারহানা। ঢাকার মিরপুরে থাকি। স্বামী প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে, আমি গৃহিণী। আজ আপনাদের সাথে শেয়ার করবো আমার সোনা কেনার তিক্ত অভিজ্ঞতা। কীভাবে ১২ লাখ টাকা দিয়ে সোনা কিনে মাত্র সাড়ে সাত লাখ টাকা ফেরত পেলাম সেই পুরো গল্পটা বলবো। যাতে আপনারা আমার মতো একই ভুল না করেন।
আমার গল্প - যেভাবে সব শুরু
২০২২ সালের জুন মাসের কথা বলছি। মা মারা যাওয়ার পর তার রেখে যাওয়া প্রায় ১২ লাখ টাকা পেয়েছিলাম। স্বামী আর শাশুড়ি দুইজনেই বললো, এই টাকা দিয়ে সোনা কিনে রাখো। দাম তো বাড়েই, কাজে লাগবে।
আমি চিন্তা করলাম, ঠিক আছে তো। সোনা তো নিরাপদ জিনিস। দামও বাড়ে। সবাই তো সোনায় টাকা রাখে। তাই ১২ লাখ টাকার ১০ ভরি সোনা কিনলাম নিউমার্কেটের একটা দোকান থেকে।
বিক্রি করতে গিয়ে যা হলো
গত মাসে মেয়ের এসএসসি পরীক্ষার পর কোচিং এ ভর্তি করাবো, প্লাস ছোট ছেলেটা অসুস্ত হয়ে পড়ল। টাকা দরকার। ভাবলাম, সোনা তো আছেই, বিক্রি করে দেই। এত দিনে দাম নিশ্চয়ই বেড়েছে।
যখন দোকানে নিয়ে গেলাম, দোকানদার বললো - আপু, এই সোনার জন্য আমি আপনাকে সাড়ে সাত লাখ টাকা দিতে পারবো।
আমি তো হতবাক। ১২ লাখ টাকায় কিনেছি, আড়াই বছর পরে বিক্রি করতে গিয়ে পাচ্ছি সাড়ে সাত লাখ? মানে সাড়ে চার লাখ টাকা উবে গেল কোথায়?
সেদিন বাসায় ফিরে অনেক কেঁদেছিলাম। মায়ের রেখে যাওয়া টাকা এভাবে নষ্ট হয়ে গেল। তারপর ঠিক করলাম, এই বিষয়ে ভালো করে জানতে হবে। কী কী ভুল হয়েছিল আমার। যাতে অন্যরা এই ভুল না করে।
আমার করা প্রথম ভুল - মেকিং চার্জ বুঝিনি
দোকানদার যখন বললো ১০ ভরি সোনার দাম এক লাখ দশ হাজার টাকা ভরি, আমি হিসাব করলাম ১১ লাখ টাকা লাগবে। কিন্তু যখন বিল এলো, দেখি ১২ লাখ ২০ হাজার টাকা। আমি জিজ্ঞেস করলাম কেন? দোকানদার বললো, আপু, এইটা তো ডিজাইনার সোনা। হাতের কাজ আছে। মেকিং চার্জ লাগবে তো।
মেকিং চার্জ ছিল ২০ শতাংশ। মানে প্রতি ভরিতে বাড়তি ২২ হাজার টাকা। ১০ ভরিতে সেটা দাঁড়ালো ২ লাখ ২০ হাজার টাকা।
কিন্তু সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেলাম বিক্রি করতে গিয়ে। দোকানদার বললো, মেকিং চার্জ তো আমরা ফেরত দেই না। শুধু সোনার দাম দিতে পারবো।
মানে আমার ২ লাখ ২০ হাজার টাকা পুরোপুরি গেল। একদম শূন্য। এই ব্যাপারটা আমি আগে জানতাম না।
দ্বিতীয় ভুল - রশিদ হারিয়ে ফেলেছিলাম
১০ ভরি সোনার মধ্যে ৪ ভরির রশিদ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কোথায় যেন রেখেছিলাম, মনে নেই। বাসা পাল্টানোর সময় হয়তো হারিয়ে গেছে।
দোকানদার বললো, রশিদ ছাড়া আমি পুরো দাম দিতে পারবো না। কারণ আপনি কবে কিনেছেন, কোন দোকান থেকে কিনেছেন - কিছুই তো বুঝা যাচ্ছে না।
রশিদ থাকা ৬ ভরিতে ভরি প্রতি ৭৫ হাজার টাকা করে দিলো। কিন্তু রশিদ না থাকা ৪ ভরিতে মাত্র ৬০ হাজার টাকা করে দিলো। মানে রশিদ না থাকার জন্য ৬০ হাজার টাকা কম পেলাম।
তৃতীয় ভুল - হলমার্ক ছিল না কিছু সোনায়
আমি জানতাম না হলমার্ক জিনিসটা আসলে কী। দোকানদার তখন কিছু বলেনি। কিনেছিলাম বিশ্বাসের উপর।
বিক্রি করতে গিয়ে দোকানদার একটা মেশিনে টেস্ট করলো। বললো, আপু, এই ৩ ভরি সোনা ২২ ক্যারেট না। এটা ২১ ক্যারেটের মতো মনে হচ্ছে।
আমি বললাম, কিন্তু আমি তো ২২ ক্যারেট কিনেছিলাম।
উনি বললেন, হলমার্ক ছিল? না থাকলে তো আমি ২২ ক্যারেট ধরতে পারবো না।
ফলাফল - ওই ৩ ভরিতে আরো ৩৫ হাজার টাকা কম পেলাম।
চতুর্থ ভুল - ভ্যাট আর অন্যান্য চার্জ বুঝতাম না
আমি যখন কিনেছিলাম, শুধু দেখেছিলাম কত টাকা লাগছে। কী কী চার্জ আছে সেটা দেখিনি। পরে বুঝলাম সোনার মূল দাম, মেকিং চার্জ, ভ্যাট পাঁচ শতাংশ, আরো কিছু চার্জ - সব মিলিয়ে যেটা ১১ লাখ টাকার সোনা, সেটা কিনতে লেগেছিল ১২ লাখ ২০ হাজার টাকা।
কিন্তু বিক্রি করার সময় শুধু সোনার ওজনের দাম পাবেন। বাকি সব চার্জ চলে যাবে।
পঞ্চম ভুল - ভেবেছিলাম সব সোনার দাম একই
আমি ভেবেছিলাম সোনা মানেই সোনা। কিন্তু না। আসলে সোনার অনেক রকমফের আছে।
বার সোনা কিনলে মেকিং চার্জ সবচেয়ে কম লাগে, মাত্র দুই থেকে পাঁচ শতাংশ। সাধারণ গহনায় আট থেকে বারো শতাংশ। আর ডিজাইনার গহনায় পনেরো থেকে পঁচিশ শতাংশ পর্যন্ত লাগে।
আমি কিনেছিলাম ডিজাইনার গহনা। তাই মেকিং চার্জ ছিল ২০ শতাংশ। বার সোনা হলে মাত্র তিন থেকে পাঁচ শতাংশ লাগতো।
ষষ্ঠ ভুল - দোকান ঠিকভাবে বাছাইনি
আমি শুধু নিউমার্কেটে গিয়ে যে দোকানে ঢুকলাম, সেখানেই কিনে ফেললাম। দোকান বাজুসের তালিকায় আছে কিনা সেটাও দেখিনি।
পরে জানলাম বাজুস মানে বাংলাদেশ জুয়েলার্স এসোসিয়েশন। তাদের একটা তালিকা আছে নির্ভরযোগ্য দোকানের। সেই দোকান থেকে কিনলে কোনো সমস্যা হয় না।
সাতম ভুল - একসাথে অনেক বেশি কিনে ফেলেছিলাম
১২ লাখ টাকা পেয়ে আমি পুরোটাই একবারে সোনায় রেখে দিলাম। কিন্তু এটা বড় ভুল ছিল।
কারণ সোনার দাম কখনো একই থাকে না। কখনো কমে, কখনো বাড়ে। একবারে সব কিনলে যদি দাম বেশি থাকে, তাহলে বেশি দামেই কিনতে হয়।
মাসে মাসে অল্প অল্প করে কিনলে কখনো কম দামে কিনতে পারতাম, কখনো বেশি দামে। গড়ে ভালো দাম হতো।
এখন আমি যেভাবে সোনা কিনি
আমি আমার ভুল থেকে শিখেছি। এখন আমি অনেক সাবধানে সোনা কিনি।
শুধু বার সোনা কিনি
গহনা আর কিনি না। বার সোনা কিনি। কারণ মেকিং চার্জ অনেক কম থাকে, মাত্র দুই থেকে তিন শতাংশ। বিক্রি করাও সহজ। ওজন ঠিক থাকে। কোনো ঝামেলা নেই।
বিয়ে বাড়িতে দিতে হবে, তখন ওই বার সোনা বিক্রি করে গহনা কিনবো। কিন্তু রেখে দেওয়ার জন্য সবসময় বার।
বাজুসের তালিকা দেখে দোকান বাছাই করি
এখন আমি কোনো দোকানে ঢুকি না। আগে বাজুসের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখি কোন কোন দোকান নির্ভরযোগ্য। তারপর সেই দোকানে যাই। বাজুস অনুমোদিত দোকানে কোনো ঝামেলা হয় না। দাম ঠিক থাকে, মান ঠিক থাকে।
রশিদ অনেক জায়গায় রাখি
এখন যখন সোনা কিনি, মূল রশিদ একটা ফাইলে রাখি। ফটোকপি করে আরেক জায়গায় রাখি। মোবাইলে ছবি তুলে গুগল ড্রাইভে রাখি। স্বামীকেও বলে রাখি কোথায় আছে। এতে রশিদ হারানোর ভয় নেই।
হলমার্ক চেক করি
এখন কেনার সময় খুব ভালো করে দেখি হলমার্ক আছে কিনা। ছোট্ট একটা স্ট্যাম্প থাকে সোনার গায়ে। সেটা দেখে নিশ্চিত হই। হলমার্ক না থাকলে ওই দোকান থেকে কিনি না। অন্য দোকানে যাই।
মাসে একটু একটু করে কিনি
এখন আর একসাথে বেশি কিনি না। প্রতি মাসে স্বামীর বেতন থেকে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা রাখি। তিন মাসে এক ভরি কিনি।
এতে কখনো দাম কম থাকলে কিনি, কখনো দাম বেশি থাকলে কিনি। গড়ে ভালো দাম হয়। চাপও কম লাগে।
বিক্রি করার আগে কয়েকটা দোকানে দাম জিজ্ঞেস করি
এখন বিক্রি করতে হলে শুধু এক জায়গায় যাই না। অন্তত তিনটা দোকানে দাম জিজ্ঞেস করি। দেখবেন এক দোকান ৭৫ হাজার টাকা দিচ্ছে, আরেক দোকান ৭৮ হাজার টাকা দিচ্ছে। এই পার্থক্যটা অনেক বড়।
বাংলাদেশে এখন সোনার দাম কেমন
এই লেখাটা লিখছি ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ। এখন বাজুস অনুযায়ী সোনার দাম প্রায় এরকম।
২২ ক্যারেট সোনা প্রায় দুই লাখ আটাশ হাজার টাকা ভরি। ২১ ক্যারেট প্রায় দুই লাখ সতেরো হাজার টাকা। আর ১৮ ক্যারেট প্রায় এক লাখ ছিয়াশি হাজার টাকা।
দাম প্রতিদিন একটু একটু বদলায়। এর সাথে যোগ হবে মেকিং চার্জ যেটা তিন থেকে পঁচিশ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। আর ভ্যাট পাঁচ শতাংশ।
মানে এক ভরি বার সোনা কিনতে এখন লাগবে প্রায় দুই লাখ পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার টাকা। কিন্তু মনে রাখবেন, সোনার দাম সবসময় বদলায়। তাই কেনার আগে অবশ্যই বাজুসের ওয়েবসাইটে দেখে নেবেন।
সোনা কেনার আগে যে জিনিসগুলো মাথায় রাখবেন
আমি এখন যা যা মনে রাখি সেগুলো আপনাদের বলছি।
এক. দোকান বাজুস অনুমোদিত কিনা দেখবেন।
দুই. আজকের সোনার দাম কত সেটা আগে জেনে নেবেন।
তিন. হলমার্ক আছে কিনা নিশ্চিত হবেন।
চার. মেকিং চার্জ কত সেটা জিজ্ঞেস করবেন।
পাঁচ. রশিদ ঠিকমতো আছে কিনা চেক করবেন।
ছয়. বার সোনা কিনুন, গহনা নয়। যদি না পরার জন্য লাগে।
সাত. একসাথে বেশি না কিনে ধীরে ধীরে কিনুন।
সোনা বিক্রি করার সময় যা হয়
আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, সোনা বিক্রি করার সময় এইসব হয়।
প্রথমে দোকানদার সোনা ওজন করবে। তারপর দেখবে কত ক্যারেট। তারপর বলবে কত টাকা দিতে পারবে।
মনে রাখবেন, বিক্রি করার সময় সবসময় কিছুটা কম দাম পাবেন। কারণ দোকানদারেরও কিছু লাভ লাগবে। তারা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কেটে রাখে। মেকিং চার্জ ফেরত পাবেন না। ভ্যাট ফেরত পাবেন না।
তাই যদি ভরি প্রতি দুই লাখ টাকায় কিনে থাকেন, দুই লাখ টাকা পাবেন না। হয়তো এক লাখ সত্তর থেকে পঁচাত্তর হাজার টাকা পাবেন।
সোনা নিয়ে কিছু কমন প্রশ্ন
এখানে কিছু প্রশ্ন যেগুলো আমার মনেও ছিল, আপনাদের মনেও থাকতে পারে।
প্রশ্ন - সোনা রাখবো নাকি ব্যাংকে এফডিআর করবো?
আমার মতে দুটোই করবেন। আয়ের ষাট শতাংশ ব্যাংকে, বিশ শতাংশ সোনায়, বিশ শতাংশ হাতে রাখবেন জরুরি খরচের জন্য।
প্রশ্ন - দুবাই বা সৌদি থেকে সোনা আনলে কি সস্তা হবে?
আমার এক বন্ধু দুবাই থেকে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু এয়ারপোর্টে ধরা পড়েছে। ডিউটি দিতে দিতে বাংলাদেশে কেনাই সস্তা পড়তো।
প্রশ্ন - পুরনো সোনা দিয়ে নতুন নিলে কি ভালো?
না, আমি এখন আর এই কাজ করি না। পুরনো বিক্রি করে ক্যাশ নেই, তারপর নতুন কিনি। এতে কম লস হয়।
প্রশ্ন - ২২ ক্যারেট নাকি ২১ ক্যারেট কিনবো?
২২ ক্যারেট ভালো। এটা সবচেয়ে জনপ্রিয়, বিক্রি করতেও সুবিধা।
সাধারণ মানুষের কিছু ভুল ধারণা
অনেকে বলে সোনা কিনলেই লাভ। কিন্তু আসলে তা না। আমার মতো অনেকেই সোনা কিনে লস করেছে।
কারণ দাম যে শুধু বাড়বে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। দুই থেকে তিন বছর দাম একই থাকতে পারে বা কমতেও পারে। মেকিং চার্জ ফেরত পাবেন না। এটা একেবারেই চলে যায়। বিক্রি করার সময় পনেরো থেকে বিশ শতাংশ কম দাম পাবেন।
তাই পাঁচ বছরের কম সময়ের জন্য সোনা কিনবেন না। যদি দশ থেকে পনেরো বছর রাখতে পারেন, তাহলে ভালো লাভ হতে পারে।
আমার এখনকার পরিকল্পনা
এখন আমি আর ভুল করি না। প্রতি মাসে পঁচিশ হাজার টাকা রাখি সোনার জন্য। তিন মাসে এক ভরি বার সোনা কিনি। বছরে চারটা ভরি হয়। পাঁচ বছরে বিশ ভরি হবে। এটা মেয়ের বিয়েতে কাজে লাগবে।
আর এখন আমি জানি সোনা শুধু বিনিয়োগ না, এটা জরুরি সময়ের জন্য রাখা সঞ্চয়। যখন খুব দরকার, তখন বিক্রি করবো। নাহলে রেখে দেব।
শেষ কথা
আমি সাড়ে চার লাখ টাকা লস করেছি সোনায়। আপনারা এই ভুল করবেন না।
মনে রাখবেন। বার সোনা কিনবেন। হলমার্ক দেখবেন। বাজুস অনুমোদিত দোকান থেকে কিনবেন। রশিদ ভালো করে রাখবেন। ধীরে ধীরে কিনবেন, একসাথে না। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করবেন।
সোনা নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে মন্তব্যে জানাতে পারেন। আমার অভিজ্ঞতা থেকে যতটুকু পারি সাহায্য করবো।
আর হ্যাঁ, একটা কথা। সোনা কিনলেই যে লাভ হবে এই ভুল ধারণা মাথা থেকে বের করে দিন। সঠিক নিয়মে, সঠিক সময়ে কিনলে তবেই লাভ হবে।
বর্তমান সোনার দাম - ফেব্রুয়ারি ২০২৬
২২ ক্যারেট সোনা - প্রায় ২ লাখ ২৮ হাজার টাকা ভরি
২১ ক্যারেট সোনা - প্রায় ২ লাখ ১৭ হাজার টাকা ভরি
১৮ ক্যারেট সোনা - প্রায় ১ লাখ ৮৬ হাজার টাকা ভরি
মনে রাখবেন এই দাম প্রতিদিন বদলায়। কেনার আগে বাজুসের ওয়েবসাইট চেক করবেন বা দোকানে ফোন করে জেনে নেবেন।
আপনাদের সবার জন্য শুভকামনা রইলো। সোনা কিনুন, কিন্তু বুদ্ধি করে কিনুন।
লেখক: ফারহানা (গৃহিণী)
