বাংলাদেশে সোনার দাম ৫০ বছরে ৯৯৩ গুণ বেড়েছে - সম্পূর্ণ ইতিহাস ও বাস্তব তথ্য , শেষ আপডেট: ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
সূচিপত্র
লেখক পরিচিতি
আমার নাম করিম উদ্দিন। ঢাকার চকবাজারে আমার স্বর্ণালংকারের দোকান আছে। তিন প্রজন্ম ধরে আমার পরিবার এই ব্যবসায় আছে। আমার দাদা ১৯৭১ সালে এই দোকান খুলেছিলেন। আমার বাবা ১৯৮৫ সাল থেকে এবং আমি ১৯৯৬ সাল থেকে এই ব্যবসার সাথে যুক্ত।
গত পঞ্চান্ন বছরে বাংলাদেশের স্বর্ণ বাজারে যা যা পরিবর্তন দেখেছি, আজ সেই অভিজ্ঞতা আপনাদের সাথে শেয়ার করবো। অনেকেই জানেন না কেন সোনার দাম এত দ্রুত বাড়ছে, কীভাবে দাম ঠিক হয়, আর বাংলাদেশে আসলে কী পরিমাণ সোনা আসে।
আমি বাংলাদেশ জুয়েলার্স এসোসিয়েশনের (বাজুস) সদস্য এবং আমার দোকান বিএসটিআই হলমার্ক অনুমোদিত। তাই যা বলছি, সেগুলো বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে।
সোনার দাম: ১৯৭১ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত
আমার দাদা যখন ১৯৭১ সালে দোকান খুলেছিলেন, তখন এক ভরি বাইশ ক্যারেট সোনার দাম ছিল মাত্র একশ সত্তর টাকা। আজ ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে সেই এক ভরি সোনার দাম দুই লাখ চৌত্রিশ হাজার ছয়শ আশি টাকা।
পঞ্চান্ন বছরে দাম বেড়েছে এক হাজার তিনশ আশি গুণেরও বেশি। তবে মুদ্রাস্ফীতির কথা মাথায় রাখলে আসল বৃদ্ধি প্রায় নয়শ তিরানব্বই গুণ।
দশক ধরে দাম বৃদ্ধি
| বছর | দাম (প্রতি ভরি) | পূর্ববর্তী থেকে বৃদ্ধি |
|---|---|---|
| ১৯৭১ | ১৭০ টাকা | শুরু |
| ১৯৮০ | ৯০০ টাকা | পাঁচ গুণ |
| ১৯৯০ | ৩,৫০০ টাকা | প্রায় চার গুণ |
| ২০০০ | ৬,৯০০ টাকা | দ্বিগুণ |
| ২০০৫ | ১৩,৮০০ টাকা | দ্বিগুণ |
| ২০১০ | ৪২,১৬৫ টাকা | তিন গুণ |
| ২০১৫ | ৪৪,০০০ টাকা | প্রায় একই |
| ২০২০ | ৭০,৮৫২ টাকা | একষট্টি শতাংশ বেশি |
| ২০২৫ | ১,৬৮,৯৭৬ টাকা | একশ আটত্রিশ শতাংশ বেশি |
| ২০২৬ (জানুয়ারি) | ২,৩৪,৬৮০ টাকা | ঊনচল্লিশ শতাংশ বেশি |
লক্ষ করুন, ২০০৫ থেকে ২০১০ - মাত্র পাঁচ বছরে দাম তিন গুণ হয়ে গেছে। তারপর ২০১০ থেকে ২০১৫ প্রায় স্থির ছিল। কিন্তু ২০২০ থেকে আবার বিস্ফোরক বৃদ্ধি শুরু হয়েছে।
কেন গত পাঁচ বছরে দাম এত বেড়েছে?
২০২১ থেকে ২০২৬ - মাত্র পাঁচ বছরে দাম বেড়েছে দুইশ একত্রিশ শতাংশ। প্রধান কারণগুলো হলো:
- প্রথমত, কোভিড-১৯ মহামারীর সময় মানুষ নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার দিকে ঝুঁকেছে।
- দ্বিতীয়ত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ায় বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
- তৃতীয়ত, বাংলাদেশি টাকা ডলারের বিপরীতে তেতাল্লিশ শতাংশ দুর্বল হয়েছে।
- চতুর্থত, আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম এক হাজার আটশ ডলার থেকে চার হাজার ডলারের উপরে উঠে গেছে।
বাংলাদেশে প্রতি বছর কত টন সোনা আসে?
বেশিরভাগ মানুষ জানেন না বাংলাদেশে আসলে কত সোনা আসে এবং কীভাবে আসে।
বাংলাদেশে প্রতি বছর চাহিদা আছে বিশ থেকে চল্লিশ টন সোনার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিদেশফেরত যাত্রীদের মাধ্যমে মোট পঁতাল্লিশ দশমিক ছয় টন সোনা এসেছে। কিন্তু এর বেশিরভাগ - প্রায় আশি শতাংশ - এসেছে অনানুষ্ঠানিক পথে।
দ্বিতীয় পথ হলো পাচার। ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাত মাসে বিজিবি এবং শুল্ক বিভাগ উদ্ধার করেছে একশ তেতাল্লিশ কেজি অবৈধ সোনা। বাজারমূল্য একশ ছিয়ানব্বই কোটি টাকা। কিন্তু এটা তো ধরা পড়া সোনা। না ধরা পড়া সোনা কত, সেটা কেউ জানে না। আমার অভিজ্ঞতা বলে, যা ধরা পড়ে সেটা মোট পাচারের দশ ভাগের এক ভাগও নয়।
তৃতীয় পথ হলো পুরনো সোনা গলিয়ে নতুন করা। বাংলাদেশের বাজারের একটা বড় অংশ এভাবে পূরণ হয়।
দুবাই থেকে আসা সোনার গোপন তথ্য
২০২৫ সালের মার্চ মাসে প্রথম আলো একটা চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছিল। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রপ্তানি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তারা বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ সোনা রপ্তানি করে। বাংলাদেশ তাদের সোনা রপ্তানির শীর্ষ দশ গন্তব্যের একটি।
কিন্তু সমস্যা হলো, বাংলাদেশ সরকারের পরিসংখ্যানে এই সোনার কোনো হিসাব নেই। মানে দুবাই বলছে তারা পাঠিয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের রেকর্ডে আসেনি। অনুমান করা হচ্ছে বত্রিশ হাজার কোটি টাকার সোনা এভাবে অবৈধ পথে এসেছে।
প্রশ্ন হলো, এই সোনা কোথায় গেল? অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন এগুলো বাংলাদেশে না থেকে আবার ভারতে পাচার হয়ে যায়। কারণ ভারতে সোনা আমদানিতে শুল্ক আঠারো দশমিক পাঁচ শতাংশ। বাংলাদেশে মাত্র আট থেকে দশ শতাংশ। তাই চোরাচালানিরা বাংলাদেশকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে। এক কেজি সোনা এভাবে পাচার করলে তারা আট থেকে নয় লাখ রুপি বাঁচায়।
কেন বাংলাদেশে সোনার দাম দুবাই বা ভারতের চেয়ে বেশি?
আমার দোকানে প্রায়ই গ্রাহকরা বলেন, "দুবাইতে কম দামে পাওয়া যায়, এখানে কেন এত দাম?"
আসল কারণগুলো বলি।
- প্রথম কারণ - আমদানি শুল্ক। একজন যাত্রী যদি বৈধভাবে সোনা আনতে চায়, তাহলে প্রতি ভরিতে চার হাজার টাকা শুল্ক দিতে হয়। এর সাথে ভ্যাট পাঁচ শতাংশ। মোট মিলিয়ে প্রতি ভরিতে পনের থেকে আঠারো হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ।
- দ্বিতীয় কারণ - ডলারের দাম। ২০২১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত টাকার মান ডলারের বিপরীতে তেতাল্লিশ শতাংশ কমেছে। ২০২১ সালে এক ডলার ছিল পঁচাশি টাকা। এখন একশ বাইশ টাকা। তাই আমদানি খরচ প্রায় অর্ধেক বেড়ে গেছে।
- তৃতীয় কারণ - আন্তর্জাতিক দাম। লন্ডন বুলিয়ন মার্কেটে প্রতি আউন্স সোনার দাম এখন চার হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ২০২২ সালের আগে এটা দুই হাজার ডলারের নিচে ছিল। মানে দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
- চতুর্থ কারণ - চাহিদা বেশি, সরবরাহ কম। প্রতি বছর চল্লিশ টন চাহিদা কিন্তু বৈধ পথে আসে মাত্র বিশ থেকে পঁচিশ টন।
- পঞ্চম কারণ - মধ্যস্বত্বভোগী। অবৈধ পথে যারা সোনা আনে, দুবাইয়ের এজেন্ট থেকে শুরু করে ঢাকার ডিলার পর্যন্ত সবাই লাভ নেয়। এই চেইনে মোট পনের থেকে বিশ শতাংশ অতিরিক্ত যোগ হয়।
বাজুস কীভাবে সোনার দাম নির্ধারণ করে?
বাংলাদেশে সোনার দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন। তারা প্রতিদিন সকাল দশটায় আন্তর্জাতিক বাজারের দাম দেখে। লন্ডন বুলিয়ন মার্কেট এবং কমেক্স ফিউচার প্রাইস চেক করে। তারপর বাংলাদেশি টাকায় রূপান্তর করে।
এর সাথে যোগ হয় আমদানি শুল্ক, পরিবহন খরচ, বীমা, এবং হলমার্কিং চার্জ। মোট মিলিয়ে দশ থেকে পনের শতাংশ। তারপর দেখা হয় বাজারে চাহিদা কেমন। বিয়ের সিজন চলছে কিনা, ঈদ আসছে কিনা, স্টক কম আছে কিনা - এসব বিবেচনা করে চূড়ান্ত দাম ঠিক হয়।
বাজুস প্রতিদিন দুইবার দাম ঘোষণা করতে পারে। সকাল সাড়ে দশটায় প্রথম আপডেট এবং বিকেল চারটায় দ্বিতীয় আপডেট - যদি আন্তর্জাতিক বাজারে বড় কোনো পরিবর্তন হয়।
২০২৬ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত (ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) সাতবার দাম পরিবর্তন হয়েছে। পাঁচবার বাড়ানো হয়েছে, দুইবার কমানো হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে সোনার দাম কেন আকাশছোঁয়া?
শুধু বাংলাদেশে না, পুরো বিশ্বেই সোনার দাম রেকর্ড ভাঙছে। কারণগুলো জানা দরকার।
- প্রথম কারণ - কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সোনা কিনছে। ২০২২ সাল থেকে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো প্রতি বছর এক হাজার টনের বেশি সোনা কিনছে। ২০১০ থেকে ২০২১ পর্যন্ত গড় ছিল মাত্র চারশ একাশি টন। মানে দ্বিগুণেরও বেশি। চীন, ভারত, তুরস্ক, পোল্যান্ড - এই দেশগুলো সবচেয়ে বেশি সোনা কিনছে। কারণ তারা ডলারের উপর নির্ভরতা কমাতে চাচ্ছে।
- দ্বিতীয় কারণ - যুদ্ধ এবং অনিশ্চয়তা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত, চীন-তাইওয়ান উত্তেজনা - এসব সময়ে মানুষ ডলার বা অন্য মুদ্রার চেয়ে সোনায় বিশ্বাস করে বেশি। কারণ সোনার মূল্য কখনো শূন্য হয় না।
- তৃতীয় কারণ - মুদ্রাস্ফীতি। সারা বিশ্বে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সাড়ে ছয় শতাংশ, ইউরোপে আট শতাংশ, বাংলাদেশে সাড়ে নয় শতাংশ। সোনা হলো মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা। টাকার মান কমলেও সোনার মান থাকে।
- চতুর্থ কারণ - ডলারের দুর্বলতা। যখন ডলার দুর্বল হয়, সোনার দাম বাড়ে। এটা একটা বিপরীত সম্পর্ক। গত দুই বছরে ডলার ইনডেক্স তিন পয়েন্ট কমেছে, আর সোনার দাম তিরিশ শতাংশ বেড়েছে।
মেকিং চার্জের আসল রহস্য
অনেক গ্রাহক আমাকে প্রশ্ন করেন, "মেকিং চার্জ কেন এত বেশি? এটা কি দোকানদারদের লুটপাট?"
আসল কথা বলি। মেকিং চার্জ তিন ভাগে ভাগ হয়।
- প্রথম ভাগ - শ্রমিকের পারিশ্রমিক। একজন দক্ষ কারিগরকে দিতে হয় দিনে এক হাজার পাঁচশ থেকে দুই হাজার টাকা। সিম্পল কারিগরের জন্য। দক্ষ কারিগর হলে আড়াই থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা। মাস্টার ক্রাফটসম্যান হলে চার থেকে ছয় হাজার টাকা দিনে। একটা ভালো ডিজাইনের নেকলেস বানাতে তিন থেকে চার দিন লাগে। ভারী ডিজাইনে পাঁচ থেকে সাত দিন। তাই শুধু শ্রমিক খরচই দশ থেকে পনের হাজার টাকা হয়ে যায়।
- দ্বিতীয় ভাগ - ওয়েস্টেজ বা অপচয়। সোনা কাটছাঁট করতে গিয়ে শূন্য দশমিক পাঁচ থেকে এক শতাংশ নষ্ট হয়। সিম্পল ডিজাইনে। ভারী ডিজাইনে দেড় থেকে দুই শতাংশ। এমনকি তিন শতাংশ পর্যন্ত। এই অপচয় গ্রাহককেই বহন করতে হয়। কারণ সোনা মূল্যবান ধাতু, ফেলে দেওয়া যায় না।
- তৃতীয় ভাগ - দোকান পরিচালনা খরচ। আমার দোকানের মাসিক খরচ বলি। ভাড়া পঞ্চাশ হাজার টাকা। বিদ্যুৎ বিল পনের হাজার টাকা। চারজন কর্মচারীর বেতন মোট আশি হাজার টাকা। নিরাপত্তা বিশ হাজার টাকা। বীমা দশ হাজার টাকা। ট্রেড লাইসেন্স ও ট্যাক্স দশ হাজার টাকা। মোট প্রায় দুই লাখ টাকা মাসে। এই খরচ তো উঠাতে হবে।
তাই মেকিং চার্জ সিম্পল ডিজাইনে পাঁচ থেকে আট শতাংশ, মাঝারি ডিজাইনে দশ থেকে পনের শতাংশ, ভারী ডিজাইনে আঠারো থেকে পঁচিশ শতাংশ হয়। আর বার সোনায় মাত্র দুই থেকে তিন শতাংশ, কারণ শুধু ঢালাই ও পালিশ লাগে।
তাই আমার পরামর্শ - বিনিয়োগের জন্য কিনছেন তো বার সোনা কিনুন। পরার জন্য কিনছেন তো সিম্পল ডিজাইন বেছে নিন।
ক্যারেট মানে কী? কোনটা কিনবেন?
অনেকে বুঝেন না ক্যারেট ব্যাপারটা আসলে কী। সোনার বিশুদ্ধতা মাপা হয় ক্যারেট দিয়ে। চব্বিশ ক্যারেট মানে একশ শতাংশ খাঁটি সোনা।
| ক্যারেট | বিশুদ্ধতা | সোনা শতাংশ | ব্যবহার | দাম (প্রতি ভরি আনুমানিক) |
|---|---|---|---|---|
| ২৪K | ৯৯.৯% | একশ ভাগ | বার/কয়েন | ২,৮৫,০০০ টাকা |
| ২২K | ৯১.৬৭% | বাইশ ভাগ চব্বিশ | গহনা (জনপ্রিয়) | ২,৩৪,৬৮০ টাকা |
| ২১K | ৮৭.৫% | একুশ ভাগ চব্বিশ | গহনা | ২,২৪,০০৭ টাকা |
| ১৮K | ৭৫% | আঠারো ভাগ চব্বিশ | ফ্যাশন জুয়েলারি | ১,৯১,৬৪৭ টাকা |
বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো বাইশ ক্যারেট। কারণ এটা যথেষ্ট খাঁটি কিন্তু একই সাথে শক্ত। গহনা বানানোর জন্য পারফেক্ট। চব্বিশ ক্যারেট খুব নরম। সহজেই বেঁকে যায়। তাই গহনায় ব্যবহার হয় না। শুধু বার সোনা বা কয়েনে।
আমার সুপারিশ - বিনিয়োগের জন্য চব্বিশ ক্যারেট বার সোনা, বিয়ের জন্য বাইশ ক্যারেট, দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য একুশ ক্যারেট, আর ফ্যাশনের জন্য আঠারো ক্যারেট।
বিয়ের সিজনে সোনার দাম কতটা বাড়ে?
বাংলাদেশে বছরে দুটো সময় সোনার দাম সবচেয়ে বেশি থাকে। নভেম্বর-ডিসেম্বর শীতকাল, যখন বেশিরভাগ বিয়ে হয়। আর আগস্ট-সেপ্টেম্বর ঈদের সময়।
| মাস | চাহিদা | দাম ট্রেন্ড | বৃদ্ধি শতাংশ | কেনার উপযুক্ততা |
|---|---|---|---|---|
| জানুয়ারি | কম | কমছে | মাইনাস দুই থেকে চার | সেরা সময় |
| ফেব্রুয়ারি | কম | স্থির | শূন্য | সেরা সময় |
| মার্চ | মাঝারি | বাড়ছে | এক থেকে দুই | ভালো |
| এপ্রিল | মাঝারি | বাড়ছে | দুই থেকে তিন | মোটামুটি |
| মে | কম | কমছে | মাইনাস এক থেকে দুই | ভালো |
| জুন | কম | স্থির | শূন্য | সেরা সময় |
| জুলাই | মাঝারি | বাড়ছে | এক থেকে দুই | মোটামুটি |
| আগস্ট | বেশি | বাড়ছে | তিন থেকে পাঁচ | দুর্বল |
| সেপ্টেম্বর | বেশি | বাড়ছে | চার থেকে ছয় | এড়িয়ে চলুন |
| অক্টোবর | অনেক বেশি | বাড়ছে | পাঁচ থেকে আট | এড়িয়ে চলুন |
| নভেম্বর | সর্বোচ্চ | সর্বোচ্চ | আট থেকে বারো | কখনই নয় |
| ডিসেম্বর | সর্বোচ্চ | সর্বোচ্চ | দশ থেকে পনের | কখনই নয় |
আমার পরামর্শ - জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি বা মে-জুনে সোনা কিনুন। এই সময় চাহিদা কম থাকে, দাম তুলনামূলক কম থাকে।
হলমার্ক না থাকলে যা হয়
হলমার্ক হলো সরকার অনুমোদিত বিএসটিআই-এর একটা সার্টিফিকেশন। এটা থাকলে বুঝা যায় সোনা আসলেই বাইশ ক্যারেট কিনা।
হলমার্ক না থাকলে যা যা সমস্যা হয়:
- প্রথম সমস্যা - ক্যারেট নিয়ে প্রতারণা। দোকানদার বলতে পারে বাইশ ক্যারেট, কিন্তু আসলে বিশ বা একুশ ক্যারেট। আপনার আট থেকে দশ শতাংশ ক্ষতি হয়ে যাবে।
- দ্বিতীয় সমস্যা - বিক্রি করতে গেলে পনের থেকে বিশ শতাংশ কম দাম পাবেন। টেস্টিং চার্জ লাগবে, ঝুঁকি বাবদ কাটা হবে, দরদাম করার সুযোগ কম থাকবে।
- তৃতীয় সমস্যা - টেস্টিং এ সময় ও ঝামেলা। টাচস্টোন টেস্ট করতে আধাঘণ্টা, এসিড টেস্ট এক ঘণ্টা, ইলেকট্রনিক টেস্ট পঁতাল্লিশ মিনিট, ল্যাব টেস্ট দুই থেকে তিন দিন।
- চতুর্থ সমস্যা - জরুরি অবস্থায় দ্রুত বিক্রি করা যায় না। হলমার্ক থাকলে পনের থেকে তিরিশ মিনিটে বিক্রি হয়ে যায়। না থাকলে তিন-চারটা দোকানে ঘুরতে হয়, দরদাম করতে হয়।
- পঞ্চম সমস্যা - ব্যাংক লোনে জামানত হিসেবে নেয় না। অনেক ব্যাংক এখন সোনা জামানতে লোন দেয়, কিন্তু শর্ত - অবশ্যই হলমার্ক থাকতে হবে।
আমার দোকানে আমি শুধু হলমার্ক সোনাই রাখি। একটু খরচ বেশি হয় (পঞ্চাশ থেকে একশ টাকা প্রতি ভরি) কিন্তু গ্রাহক নিশ্চিন্ত থাকে।
সোনা বিক্রি করার সময় যা হয়
অনেকে সোনা কিনতে আসে কিন্তু জানে না বিক্রি করতে গেলে কী হবে। একটা হিসাব দেখি।
ধরুন আপনি এক ভরি সোনা কিনলেন। খরচ হলো:
- সোনার মূল দাম: দুই লাখ চৌত্রিশ হাজার ছয়শ আশি টাকা
- মেকিং চার্জ (বিশ শতাংশ): ছেচল্লিশ হাজার নয়শ ছত্রিশ টাকা
- ভ্যাট (পাঁচ শতাংশ): চৌদ্দ হাজার একাশি টাকা
- মোট: দুই লাখ পঁচানব্বই হাজার ছয়শ সাতানব্বই টাকা (প্রায় তিন লাখ টাকা)
এক বছর পরে দাম একই আছে। এখন বিক্রি করতে গেলেন। দোকানদার যা দেবে:
- সোনার দাম: দুই লাখ চৌত্রিশ হাজার ছয়শ আশি টাকা
- এর থেকে কাটবে (পনের শতাংশ): পঁয়ত্রিশ হাজার দুইশ দুই টাকা
- পাবেন: এক লাখ নিরানব্বই হাজার চারশ আটাত্তর টাকা (প্রায় দুই লাখ টাকা)
মানে তিন লাখ টাকা দিয়ে কিনলেন, দুই লাখ টাকা পেলেন। এক লাখ টাকা লস। মেকিং চার্জ ফেরত পাবেন না। ভ্যাট ফেরত পাবেন না। পনের শতাংশ কাটা দোকানদারের লাভ।
তাই বলছি, সোনা কিনুন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করে। পাঁচ থেকে দশ বছরের জন্য। নাহলে লস হবে।
বার সোনা বনাম গহনা - হিসাব
আমি সবাইকে বলি বার সোনা কিনতে। কেন? হিসাব দেখুন।
এক ভরি বার সোনা:
- সোনার দাম: দুই লাখ চৌত্রিশ হাজার ছয়শ আশি টাকা
- মেকিং চার্জ (তিন শতাংশ): সাত হাজার চল্লিশ টাকা
- ভ্যাট (পাঁচ শতাংশ): বারো হাজার ছিয়াশি টাকা
- মোট: দুই লাখ তিপ্পান্ন হাজার আটশ ছয় টাকা
এক ভরি ডিজাইনার গহনা:
- সোনার দাম: দুই লাখ চৌত্রিশ হাজার ছয়শ আশি টাকা
- মেকিং চার্জ (বিশ শতাংশ): ছেচল্লিশ হাজার নয়শ ছত্রিশ টাকা
- ভ্যাট (পাঁচ শতাংশ): চৌদ্দ হাজার একাশি টাকা
- মোট: দুই লাখ পঁচানব্বই হাজার ছয়শ সাতানব্বই টাকা
পার্থক্য: একচল্লিশ হাজার আটশ একানব্বই টাকা।
এখন বিক্রি করার সময় বার সোনা বিক্রি করলে পাবেন প্রায় দুই লাখ পনের হাজার টাকা। গহনা বিক্রি করলে পাবেন প্রায় এক লাখ নিরানব্বই হাজার টাকা। বার সোনায় ষোল হাজার টাকা বেশি পাবেন।
প্রতি মাসের দাম পরিবর্তনের প্যাটার্ন
আমি গত দশ বছরের ডেটা দেখেছি। একটা প্যাটার্ন পেয়েছি।
- জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি: দাম কম থাকে। বিয়ে সিজন শেষ।
- মার্চ-এপ্রিল: একটু বাড়তে থাকে।
- মে-জুন: দাম কম। গরম, কেনাকাটা কম।
- জুলাই-আগস্ট: বাড়তে শুরু করে। ঈদ আসে।
- সেপ্টেম্বর-অক্টোবর: বেশ বাড়ে।
- নভেম্বর-ডিসেম্বর: সবচেয়ে বেশি। বিয়ে সিজন।
তাই বুদ্ধিমানরা কেনে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি বা মে-জুনে। দশ থেকে পনের শতাংশ সাশ্রয় হয়।
সোনা পাচারের আসল চিত্র
আমি যা যা দেখেছি তিরিশ বছরে।
- প্রথম পথ - বিদেশফেরত যাত্রীরা। অনেকে তিন-চারজন মিলে একসাথে দশ থেকে বিশ ভরি নিয়ে আসে। এয়ারপোর্টে শুল্ক দেয় দুই-তিন ভরির। বাকিটা লুকিয়ে নেয়। কোমরে বেঁধে, জুতায় লুকিয়ে, এমনকি পেটের ভেতর ক্যাপসুল করে।
- দ্বিতীয় পথ - সীমান্ত দিয়ে। ভারত সীমান্ত দিয়ে অনেক সোনা আসে এবং যায়ও। বাংলাদেশে দাম বেশি হলে ভারতে নিয়ে যায়। কম হলে আনে। বেনাপোল, শার্শা, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ - এসব সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন পাচার হয়।
- তৃতীয় পথ - সমুদ্রপথে। কখনো কখনো বড় চালান আসে নৌকা বা ট্রলারে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এলাকায়।
বিজিবি এবং কাস্টমস যা ধরে সেটা হিমশৈলের চূড়া মাত্র। আসল পরিমাণ দশ থেকে পনের গুণ বেশি।
যে সময় কখনো সোনা কিনবেন না
আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। চারটা সময় সোনা কিনবেন না।
- প্রথম - যখন দাম দ্রুত বাড়ছে। অনেকে ভাবে দাম বাড়ছে, এখনই কিনে ফেলি। কিন্তু দ্রুত বাড়লে দ্রুত কমেও যায়। একটু অপেক্ষা করুন।
- দ্বিতীয় - বিয়ের ঠিক আগে। যদি এক-দুই মাস পরে বিয়ে, এখনই কিনবেন না। দাম বেশি থাকে। চার-পাঁচ মাস আগে থেকে কিনতে থাকুন।
- তৃতীয় - ঈদের আগে। ঈদের পনের থেকে বিশ দিন আগে দাম বেশি থাকে।
- চতুর্থ - যখন আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা। হঠাৎ যুদ্ধ বা বড় কোনো ইভেন্ট হলে অপেক্ষা করুন। দাম ওঠানামা করবে। স্থির হওয়ার পর কিনুন।
পুরনো সোনার আসল মূল্য
অনেকে পুরনো সোনা বিক্রি করতে আসে। তখন যা হয়।
- প্রথমত, ওজন কমে যায়। মনে করেন দশ ভরি সোনা ছিল। দশ-পনের বছর পরে দেখা গেল সাড়ে নয় ভরি। কিছুটা ক্ষয় হয়েছে। পরার সাথে সাথে ঘর্ষণে কিছু সোনা বের হয়ে গেছে।
- দ্বিতীয়ত, খাদ মিশে যায়। ধুলাবালি লেগে থাকে। টেস্ট করলে ক্যারেট কম পাওয়া যায়।
- তৃতীয়ত, রশিদ না থাকলে পনের থেকে বিশ শতাংশ কম দাম পাবেন। কারণ দোকানদার নিশ্চিত হতে পারে না এটা কোথা থেকে এলো।
- চতুর্থত, হলমার্ক না থাকলে টেস্ট করতে হয়। টেস্টিং চার্জ লাগে। আর ক্যারেট কম পেলে সেই হিসেবে দাম।
তাই পুরনো সোনা বিক্রি না করে ভাঙিয়ে নতুন করাই ভালো। ভাঙানো চার্জ পঞ্চাশ থেকে একশ টাকা প্রতি ভরি। নতুন মেকিং চার্জ লাগবে। কিন্তু সোনার মূল্য ঠিক থাকবে।
শেষ কথা: আটটি সোনালি পরামর্শ
তিন প্রজন্মের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, সোনা একটি নিরাপদ বিনিয়োগ। কিন্তু বুঝেশুনে কিনতে হয়।
- প্রথম পরামর্শ - বার সোনা কিনুন, গহনা নয়। যতক্ষণ না পরার দরকার।
- দ্বিতীয় পরামর্শ - হলমার্ক দেখে কিনুন। পঞ্চাশ থেকে একশ টাকা বেশি হলেও নিন।
- তৃতীয় পরামর্শ - বাজুস অনুমোদিত দোকান থেকে কিনুন।
- চতুর্থ পরামর্শ - রশিদ ভালো করে সংরক্ষণ করুন। মূল রশিদ, ফটোকপি এবং ছবি তুলে রাখুন।
- পঞ্চম পরামর্শ - দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করুন। পাঁচ থেকে দশ বছর।
- ষষ্ঠ পরামর্শ - প্রতি মাসে অল্প অল্প করে কিনুন। একসাথে বেশি না।
- সপ্তম পরামর্শ - জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি বা মে-জুনে কিনুন।
- অষ্টম পরামর্শ - বিক্রি করার আগে তিন-চারটা দোকানে দাম জিজ্ঞেস করুন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রশ্ন: সোনার দাম কত দ্রুত বাড়ছে?
গত পঞ্চান্ন বছরে সোনার দাম গড়ে বার্ষিক সাড়ে তেরো শতাংশ হারে বেড়েছে। তবে গত পাঁচ বছরে বৃদ্ধি হয়েছে বার্ষিক তেইশ শতাংশ।
প্রশ্ন: বিনিয়োগের জন্য কোন ক্যারেট সোনা সেরা?
বিনিয়োগের জন্য চব্বিশ ক্যারেট বার সোনা সবচেয়ে ভালো। সর্বোচ্চ বিশুদ্ধতা, সবচেয়ে কম মেকিং চার্জ, বিক্রিতে সেরা দাম।
প্রশ্ন: দশ তোলা মানে কত ভরি?
এক তোলা সমান এগারো দশমিক ছয় ছয় চার গ্রাম। প্রায় এক ভরি। তাই দশ তোলা মানে প্রায় দশ ভরি।
প্রশ্ন: সোনা কেনার সবচেয়ে ভালো সময় কখন?
জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি এবং মে-জুন। এই চার মাস সবচেয়ে ভালো। এ সময় দাম পিক সিজনের চেয়ে দশ থেকে পনের শতাংশ কম থাকে।
প্রশ্ন: অনলাইনে সোনা কিনলে কি হলমার্ক থাকে?
নির্ভর করে কোন প্ল্যাটফর্ম থেকে কিনছেন। বাজুস অনুমোদিত অনলাইন দোকান থেকে কিনলে হলমার্ক থাকবে। কেনার আগে নিশ্চিত হয়ে নিন এবং ডেলিভারির সময় চেক করুন।
প্রশ্ন: পুরনো সোনা নতুন করতে কত খরচ?
ভাঙানো চার্জ পঞ্চাশ থেকে একশ টাকা প্রতি ভরি। নতুন মেকিং চার্জ ডিজাইন অনুযায়ী পাঁচ থেকে পঁচিশ শতাংশ। হলমার্কিং পঞ্চাশ থেকে একশ টাকা প্রতি ভরি।
প্রশ্ন: সোনা জমা রেখে কি ব্যাংক থেকে লোন নেওয়া যায়?
হ্যাঁ। অনেক ব্যাংক এবং এনবিএফআই সোনা জামানতে লোন দেয়। শর্ত হলো হলমার্ক থাকতে হবে, রশিদ লাগবে। সোনার মূল্যের ষাট থেকে পঁচাত্তর শতাংশ পর্যন্ত লোন পাবেন। সুদের হার দশ থেকে চৌদ্দ শতাংশ।
প্রশ্ন: বিদেশ থেকে সোনা আনতে কত শুল্ক?
একজন যাত্রী একশ সতের গ্রাম (প্রায় দশ ভরি) বৈধভাবে আনতে পারেন। শুল্ক চার হাজার টাকা প্রতি ভরি। বাণিজ্যিক আমদানিতে শুল্ক দশ থেকে বারো শতাংশ, ভ্যাট পাঁচ শতাংশ।
প্রশ্ন: কোন দোকান থেকে সোনা কিনবো?
বাজুস সদস্য দোকান থেকে কিনুন। হলমার্কিং লাইসেন্স আছে কিনা চেক করুন। ট্রেড লাইসেন্স দেখান কিনা, প্রপার রশিদ দেয় কিনা, বাজুস দাম মানে কিনা - এসব দেখুন।
প্রশ্ন: সোনা কতদিন রেখে বিক্রি করলে লাভ হবে?
ন্যূনতম পাঁচ বছর। আদর্শ সাত থেকে দশ বছর। দীর্ঘমেয়াদী পনের বছরের বেশি। পাঁচ বছরের কমে বিক্রি করলে মেকিং চার্জ আর ভ্যাট উঠবে না।
বর্তমান সোনার দাম (৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
বাজুস অনুমোদিত সর্বশেষ মূল্য:
| ক্যারেট | প্রতি ভরি (টাকা) | প্রতি গ্রাম (টাকা) |
|---|---|---|
| ২২ ক্যারেট | ২,৩৪,৬৮০ | ২০,১২৬ |
| ২১ ক্যারেট | ২,২৪,০০৭ | ১৯,২১০ |
| ১৮ ক্যারেট | ১,৯১,৬৪৭ | ১৬,৪৩৬ |
| সনাতন পদ্ধতি | ১,৫৮,৯৭২ | ১৩,৬৩৪ |
মনে রাখবেন, এই দাম প্রতিদিন বদলায়। কেনার আগে অবশ্যই বাজুসের ওয়েবসাইট চেক করবেন বা দোকানে ফোন করে জেনে নেবেন।
আপনাদের সবার জন্য শুভকামনা। সোনা কিনুন, কিন্তু বুদ্ধিমানের সাথে।
করিম উদ্দিন
করিম জুয়েলার্স, চকবাজার, ঢাকা
বাজুস সদস্য | বিএসটিআই হলমার্ক অনুমোদিত
